|
ভালোবাসা ভিক্ষা করে নয়, আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে হয়
এস এম আওলাদ হোসেন
|
|
এস এম আওলাদ হোসেন। সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।
মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক আসে আশীর্বাদ হয়ে, কিছু সম্পর্ক আসে শিক্ষা হয়ে। কেউ হাত ধরে পথ দেখায়, কেউ মাঝপথে হাত ছেড়ে দেয়। আবার কেউ এতটাই কাছে থেকেও এমন দূরত্ব তৈরি করে, যেখানে একটি ফোনকল, একটি খোঁজ নেওয়া কিংবা একটি ‘কেমন আছো ?’—সেটুকুও যেন অমূল্য হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে মানুষটি আপনার খবর নিতে চায় না, তার কাছ থেকে ভালোবাসা আদায় করতে বারবার নিজেকেই কেন ছোট করবেন ? ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও সম্পর্ক—এসব জোর করে পাওয়া যায় না। সম্পর্কের দরজা দুদিক থেকেই খুলতে হয়। এক পক্ষ যদি সারাক্ষণ এগিয়ে যায় আর অন্য পক্ষ বারবার পিছিয়ে আসে, সেখানে একসময় সম্পর্ক নয়, তৈরি হয় মানসিক ক্লান্তি। আধুনিক মনোবিজ্ঞানও সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্বকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের সামাজিক সংযোগবিষয়ক কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় প্রতি ছয়জনের একজন একাকিত্ব অনুভব করেন। দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ সম্পর্ক আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু সব সম্পর্ক নয়। যে সম্পর্ক আমাদের মানবিক মর্যাদা, মানসিক শান্তি ও আত্মসম্মানকে প্রতিনিয়ত ক্ষয় করে, সেই সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। কাউকে ভালোবাসা অপরাধ নয়। সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের ভালোবাসা, বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, বন্ধুত্ব কিংবা প্রিয়জনের প্রতি মমতা—এসব মানবজীবনের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু ভালোবাসার অর্থ এই নয় যে, আপনি সারাক্ষণ অন্যের স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করবেন। কেউ ফোন করল না—আপনি করলেন। থামা মানে ভালোবাসা শেষ করে দেওয়া নয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় প্রত্যাখ্যান বা বর্জনের অভিজ্ঞতা মানুষের কাছে গভীর মানসিক আঘাত তৈরি করতে পারে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের আলোচনাতেও সামাজিক প্রত্যাখ্যানের এই মানসিক যন্ত্রণার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তাই প্রত্যেক অবহেলার জবাব আরও বেশি ভালোবাসা দিয়ে দিতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। আমাদের সমাজে একটি বিপজ্জনক ধারণা আছে—‘সে তো আপনজন।’ এই একটি বাক্য ব্যবহার করে অনেক মানুষ অন্যের অবহেলা, অপমান, মানসিক চাপ এমনকি সম্পর্কের ভেতরের ক্ষতিকর আচরণও বছরের পর বছর সহ্য করেন। কিন্তু আপনজন হওয়া আর ভালো মানুষ হওয়া এক বিষয় নয়। একজন মানুষ আপনার সন্তান হতে পারেন, প্রিয়জন হতে পারেন, আত্মীয় হতে পারেন কিংবা বহু বছরের পরিচিত হতে পারেন—তবু তার আচরণ যদি নিয়মিতভাবে আপনাকে অপমানিত, অপরাধী, অযোগ্য কিংবা একাকী করে তোলে, তাহলে সেই আচরণকে প্রশ্ন করার অধিকার আপনার আছে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক সংজ্ঞায় ‘toxic relationship’-এর মধ্যে মানসিক প্রভাব বিস্তার, নিয়ন্ত্রণ, গ্যাসলাইটিং, অসম্মান, সহযোগিতার অভাব এবং ক্ষতিকর যোগাযোগের মতো আচরণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব সম্পর্ক পরিবার, বন্ধুত্ব, প্রেম কিংবা কর্মক্ষেত্র—যেকোনো জায়গাতেই হতে পারে। সুতরাং সম্পর্ক রক্ষা করার নামে নিজেকে ধ্বংস করা কোনো মহৎ কাজ নয়। জীবনে কেউ আপনাকে ঠকিয়েছে—এটা আপনার ব্যর্থতার প্রমাণ নয়। কেউ আপনার মূল্য বুঝতে পারেনি—তাতে আপনার মূল্য কমে যায় না। কেউ আপনাকে দোষী বানিয়েছে—তাতে আপনি সত্যিই দোষী হয়ে যান না। অনেক সময় মানুষ নিজের ভুল স্বীকার না করে দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে স্বস্তি খোঁজে। আবার কেউ নিজের অপরাধবোধ থেকে বাঁচতে এমন একটি গল্প তৈরি করে, যেখানে অন্য মানুষটিই হয়ে যায় সব সমস্যার কারণ। এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় ভুল হলো—নিজেকে সারাক্ষণ প্রমাণ করার চেষ্টা করা। সবাইকে বোঝানো সম্ভব নয়। জীবনের একটি পর্যায়ে এসে বুঝতে হয়—সত্যের সবচেয়ে বড় সাক্ষী মানুষের বাহবা নয়, নিজের বিবেক। হার্ভার্ডের দীর্ঘমেয়াদি Adult Development Study-ও দেখিয়েছে, মানুষের সুস্থতা ও দীর্ঘমেয়াদি সুখের সঙ্গে অর্থবহ সম্পর্কের গভীর যোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নেতিবাচক সম্পর্ক ও অতীতের ব্যর্থতা থেকে নিজেকে মুক্ত করার গুরুত্বও গবেষণার আলোচনায় এসেছে। অতএব সম্পর্ক দরকার—কিন্তু সুস্থ সম্পর্ক দরকার। ভালোবাসা দরকার—কিন্তু আত্মসম্মান হারিয়ে নয়। এখানেই আসে জীবনের আরও গভীর প্রশ্ন।মানুষ আমাদের সঙ্গে কী করেছে—তার সব হিসাব কি আমাদেরই মেটাতে হবে ? কেউ অবহেলা করেছে, কেউ প্রতারণা করেছে, কেউ অন্যায়ভাবে অপবাদ দিয়েছে, কেউ আমাদের ভালোবাসাকে দুর্বলতা ভেবেছে—এসবের প্রতিটি জবাব দিতে গিয়ে যদি জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করি, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা কার ? আমাদেরই। ইসলামের দৃষ্টিতে দুনিয়ার জীবন চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে এবং প্রকৃত সফলতা হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করা। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে পালিয়ে যেতে শেখায় না; বরং জীবনের অগ্রাধিকার ঠিক করতে শেখায়। অন্যায় হলে ন্যায়বিচার চাইতে হবে। কারণ পৃথিবীর প্রতিটি বিরোধের চেয়ে বড় হলো নিজের চরিত্র, নিজের আমল এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজের জবাবদিহি। জীবনের একটি পর্যায়ে এসে বলতে হয়—আমি সবাইকে ভালোবাসব, কিন্তু সবার কাছ থেকে ভালোবাসা দাবি করব না। আমি দায়িত্ব পালন করব, কিন্তু বিনিময়ে স্বীকৃতি ভিক্ষা করব না। আমি ক্ষমা করতে চেষ্টা করব, কিন্তু একই আঘাত বারবার গ্রহণ করার জন্য নিজেকে সমর্পণ করব না। আমি মানুষের জন্য দোয়া করব, কিন্তু নিজের শান্তি নষ্ট করে কারও দরজায় দাঁড়িয়ে থাকব না। কারণ মানুষ বদলায়। সম্পর্ক বদলায়। অগ্রাধিকার বদলায়। একসময় যারা প্রতিদিন কথা বলত, তারা অপরিচিত হয়ে যেতে পারে। আবার কোনো অপরিচিত মানুষ জীবনের কঠিন সময়ে আপনজনের মতো পাশে দাঁড়াতে পারে। তাই সম্পর্কের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে কথায় নয়—আচরণে। যে সত্যিই আপনাকে ভালোবাসে, তার কাছে আপনার অস্তিত্ব বারবার প্রমাণ করতে হয় না। কেউ আপনার খোঁজ নেয় না—তাকে জোর করে কাছে টেনে রাখার প্রয়োজন নেই। কেউ আপনাকে মূল্য দেয় না—নিজেকে তার চোখে মূল্যবান প্রমাণ করতে গিয়ে জীবন নষ্ট করবেন না। কেউ আপনাকে অন্যায়ভাবে দোষী বানায়—প্রতিটি মানুষের কাছে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে যাবেন না। চুপ থাকা সবসময় দুর্বলতা নয়। কিছু সম্পর্ককে ছেড়ে দিতে হয়—অভিশাপ দিয়ে নয়, শিক্ষা নিয়ে। কিছু মানুষকে ক্ষমা করতে হয়—তাদের জন্য নয়, নিজের অন্তরের শান্তির জন্য। আর কিছু হিসাব পৃথিবীর আদালতে নয়, আল্লাহর আদালতের ওপর ছেড়ে দিতে হয়। কারণ শেষ পর্যন্ত জীবনের সবচেয়ে বড় জয় হলো—কে আপনাকে কতটা ভালোবাসল, তা নয়; বরং আপনি কতটা সৎ থাকলেন, কতটা অন্যায় থেকে বাঁচলেন এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য নিজেকে কতটা প্রস্তুত করলেন। কোরআনের ভাষায়, প্রশান্ত আত্মাকে বলা হবে—তার রবের দিকে ফিরে যেতে, সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে; এবং তার জন্য রয়েছে জান্নাত। তাই দুনিয়ার কিছু দরজা বন্ধ হয়ে গেলে সব দরজা বন্ধ হয়ে যায় না। কখনো কখনো মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাশা কমিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা বাড়ানোই জীবনের সবচেয়ে বড় মুক্তি। চাওয়া-পাওয়ার হিসাব একদিন চুকিয়ে দিন। এস এম আওলাদ হোসেন। সাংবাদিক ও কলামিস্ট।। ০১৬৩৭৬৫৪৪৭১ |
