|
প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে: আইন, বাস্তবতা ও সামাজিক প্রভাব
এস এম আওলাদ হোসেন
|
|
প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে: আইন, বাস্তবতা ও সামাজিক প্রভাব
এস এম আওলাদ হোসেন, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।
প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে না করার বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে এর প্রভাব খুবই সীমিত। আইনের দুর্বল প্রয়োগ, সামাজিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘসূত্র আইনি প্রক্রিয়ার কারণে একদিকে যেমন অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে বেড়ে চলেছে স্বামীকে রেখে বা আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ ছাড়াই নারীদের পুনর্বিবাহের ঘটনাও। এই দ্বিমুখী সংকট পরিবার, সমাজ ও আইনি ব্যবস্থাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী একজন পুরুষ একাধিক বিয়ে করতে চাইলে প্রথম স্ত্রীর লিখিত সম্মতি ও স্থানীয় সালিশি পরিষদের অনুমোদন নেওয়ার বিধান রয়েছে। অনুমতি ব্যতীত বিয়ে করলে শাস্তির কথাও আইনে উল্লেখ আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়—অনেক বিয়ে নিবন্ধনের বাইরে থেকে যায়। সালিশি পরিষদের অনুমোদন প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া হয়। শাস্তির বিধান কার্যত প্রয়োগ হয় না। ফলে আইন থাকলেও তার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ।
উচ্চ আদালত বিভিন্ন রায় ও পর্যবেক্ষণে প্রথম স্ত্রীর অধিকার সুরক্ষা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের কথা বলেছে। তবে এসব নির্দেশনা প্রশাসনিক পর্যায়ে কার্যকর নজরদারিতে রূপ না নেওয়ায় সমাজে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দেশনার সঙ্গে যদি বাধ্যতামূলক নজরদারি ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থা না থাকে, তবে তা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।
নারী অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, গ্রাম ও শহর উভয় এলাকাতেই অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ের অভিযোগ নিয়মিতভাবে আসছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে—
প্রথম স্ত্রী আইনি সহায়তা পেতে দেরি করেন। সামাজিক চাপ ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার কারণে মামলা করতে পারেন না। পরিবার ও সমাজ বিষয়টি ‘ব্যক্তিগত’ বলে এড়িয়ে যায়। এর ফলে ভুক্তভোগী নারীরা ভরণপোষণ ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পারিবারিক আদালত ও আইন সহায়তা সংস্থাগুলোর কাছে এমন অভিযোগও বাড়ছে, যেখানে নারীরা আনুষ্ঠানিক তালাক সম্পন্ন না করেই নতুন সম্পর্কে জড়াচ্ছেন বা বিয়ে করছেন। এর পেছনে রয়েছে—দীর্ঘ ও জটিল তালাক প্রক্রিয়া।ভরণপোষণ আদায়ে অনিশ্চয়তা। পারিবারিক সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা। এই পরিস্থিতি আইনগতভাবে যেমন জটিলতা তৈরি করছে, তেমনি সামাজিকভাবেও অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই ধরনের অনিয়মের প্রভাব সুদূরপ্রসারী— পরিবার ভাঙনের হার বৃদ্ধি। শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব।
উত্তরাধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণে আইনি বিরোধ।
পারিবারিক কাঠামোর ওপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়া।
আইনবিদরা বলছেন, বর্তমান আইন যুগোপযোগী হলেও প্রয়োগ দুর্বল। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কেবল শাস্তিমূলক আইন নয়, সামাজিক সচেতনতা ও দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। নারী অধিকার কর্মীরা মনে করেন, ভরণপোষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে নারীরা আইনের বাইরে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট মহলের প্রস্তাব—বিয়ে ও তালাকের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ডিজিটাল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা।
অনুমতি ছাড়া বিয়ের জন্য তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। ভরণপোষণ মামলায় সময়সীমা নির্ধারণ।
নারী ও শিশুদের জন্য বিনা খরচে আইনি সহায়তা।
ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম।
প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে কিংবা আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ ছাড়া পুনর্বিবাহ—দুটোই পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগজনক। কেবল আদালতের নির্দেশনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর আইন প্রণয়ন, কঠোর বাস্তবায়ন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। তা না হলে এই সংকট আরও গভীর হবে, যার প্রভাব পড়বে পুরো সমাজের ওপর।
এস এম আওলাদ হোসেন।
সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।
01637654471
|
