|
কথায় আদর্শ, কাজে বিপরীত: সমাজের নীরব সংকট
এস এম আওলাদ হোসেন।
|
|
এস এম আওলাদ হোসেন।
সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।
সমাজে এমন এক শ্রেণির মানুষের উপস্থিতি দিন দিন দৃশ্যমান হচ্ছে, যারা কথায় নীতি-নৈতিকতার চূড়ান্ত পাঠ দেন, কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই নীতির সামান্য প্রতিফলনও দেখা যায় না।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোরালো বক্তৃতা করেন, অথচ সুযোগ পেলেই দুর্নীতির আশ্রয় নেন। দালালির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা বলেন, কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থে দালালির পথেই হাঁটেন। মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে সচেতনতার ভাষণ দেন, অথচ নিজেরাই মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থেকে মুক্ত নন। এই দ্বিচারিতা শুধু ব্যক্তি চরিত্রের দুর্বলতা নয়; এটি সমাজের জন্য এক গভীর নৈতিক সংকট।
বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা, সততা কিংবা আদর্শের চেয়ে প্রচার, প্রভাব এবং নিজেকে উপস্থাপনের কৌশল বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে এমন মানুষও সমাজে সম্মানিত অবস্থানে পৌঁছে যাচ্ছেন, যাদের বক্তব্য ও বাস্তব আচরণের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। তারা জানেন কীভাবে জনসমক্ষে গ্রহণযোগ্য ভাষা ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে নিজেদের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাহ্যিক চাকচিক্য দিয়ে সত্যকে দীর্ঘদিন আড়াল করা যায় না।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা সহজ, কিন্তু দুর্নীতির প্রলোভন থেকে নিজেকে দূরে রাখা কঠিন। দালালির সমালোচনা করা সহজ, কিন্তু ব্যক্তিগত লাভের জন্য প্রভাবের অপব্যবহার না করা কঠিন। মাদকের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া সহজ, কিন্তু নিজের জীবনকে সুশৃঙ্খল রাখা কঠিন। প্রকৃত চরিত্রের পরিচয় বক্তৃতায় নয়, আচরণে প্রকাশ পায়।
সমস্যা হলো, সমাজের একটি অংশ প্রায়ই কথার চেয়ে কাজকে কম গুরুত্ব দেয়। ফলে যারা সুন্দরভাবে কথা বলতে পারে, তারা অনেক সময় প্রকৃত সৎ ও নীরব কর্মীদের চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। এতে করে তরুণ প্রজন্মের সামনে ভুল বার্তা যায়। তারা ভাবতে শুরু করে যে সফল হওয়ার জন্য আদর্শের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন শুধু প্রভাবশালী উপস্থিতি এবং জনসমক্ষে গ্রহণযোগ্য কিছু বক্তব্য।
কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। সমাজে স্থায়ী সম্মান পেয়েছেন তারা, যাদের কথার সঙ্গে কাজের মিল ছিল। মানুষ হয়তো কিছু সময়ের জন্য ভণ্ডামিকে প্রশ্রয় দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সততা ও সত্যনিষ্ঠাকেই মূল্যায়ন করে। কারণ বিশ্বাস এমন একটি সম্পদ, যা একবার হারালে পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।
একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি। যারা অন্যের ভুল নিয়ে কথা বলেন, তাদের আগে নিজের অবস্থান যাচাই করা উচিত। কারণ সমাজের মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা শুধু বক্তৃতা শোনে না, বক্তার জীবন ও কর্মকাণ্ডও পর্যবেক্ষণ করে।
অতএব, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হলে আগে নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। দালালির বিরুদ্ধে কথা বলতে হলে নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনৈতিক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়তে হলে আগে নিজের জীবনকে মাদকমুক্ত রাখতে হবে। অন্যথায় সেই বক্তব্য কেবল শব্দের সমাহার হয়ে থাকবে, যার কোনো নৈতিক শক্তি থাকবে না।
আজকের সমাজের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বুদ্ধিমান মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়; প্রয়োজন সৎ, দায়িত্বশীল এবং কথার সঙ্গে কাজের মিল আছে—এমন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি। কারণ বক্তৃতা সমাজকে সাময়িকভাবে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু চরিত্রই সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে পথ দেখায়।
এস এম আওলাদ হোসেন।
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।
01637654471
|
